Inauguration of the Center

/
প্রতিষ্ঠার ইতিহাস
Inauguration of Center

Inauguration of Center



কলা অনুষদের আওতাধীন উচ্চতর মানববিদ্যা গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার পর ১৯৮৪ সালের ৩১ মে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনীর মাধ্যমে কেন্দ্রের কার্যক্রম শুরু হয়। তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ শামসুল হক এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন এবং তৎকালীন ডিন ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, প্রথম পরিচালক দর্শন বিভাগের অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম এবং প্রথম সভাপতি ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক মমতাজুর রহমান তরফদার বক্তব্য প্রদান করেন। এছাড়া ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক সালাহউদ্দীন আহম্মদ "ঊনিশ শতকের মুসলিম সমাজচিন্তায় লোকায়ত ধারা” শীর্ষক একটি উদ্বোধনী প্রবন্ধ পাঠ করেন।

উদ্বোধনী ভাষণে উপাচার্য বলেন যে, কলা অনুষদের অধীন এরূপ একটি বিদ্যাচর্চা গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ দেশ ও জাতির প্রভৃত কল্যাণে আসবে এবং দেশ ও জাতির উন্নয়নে এবং একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র গঠনে সহায়ক হবে। তাই এই গবেষণাকে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিমণ্ডলে সীমাবদ্ধ না রেখে বৃহত্তর সমাজে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। তিনি বলেন :

আমার মনে হয় যে, জ্ঞান ও সত্যের প্রতি অনুরাগ শুধু পাণ্ডিত্যের সোপানই নয়, মহত্ত্বের অন্যতম লক্ষণও বটে। আর এ ধরনের জ্ঞানের চর্চাই হওয়া উচিত বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। যে সমাজে জ্ঞান ও জ্ঞানী ব্যক্তিদের কদর নেই, সেই সমাজ নির্জীব; আর যে সমাজে জ্ঞানের যত বেশী মর্যাদা, সেই সমাজ ততই অগ্রসর ও উন্নত। এ ধরনের জ্ঞানানুরাগ আমাদের সমাজের সর্বত্র বিস্তার লাভ করুক, আমাদের অর্জিত জ্ঞান সমাজে নৈতিক প্রভাব বিস্তার করুক এবং এর ফলে আমাদের দেশ ও জাতি সারা বিশ্বের চোখে উপযুক্ত মর্যাদার আসন লাভ করুক, আজকের এই মহতী অনুষ্ঠানে তা- ই আমি আশা করি।

উদ্বোধনী সভায় কলা অনুষদের তৎকালীন ডিন অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন:

মানববিদ্যা হচ্ছে সকল বিদ্যার কেন্দ্র ভূমি। মানুষ অন্য কিছু এবং অনেক কিছু হতে পারে, হওয়া স্বাভাবিক এবং হওয়া প্রয়োজন; কিন্তু সবার আগে যে মানুষকে মানুষ হতে হবে এই কথাটাই মানববিদ্যা চর্চার মূল কথা আসলে। আজকের দিনে পুঁজিবাদী বিশ্বে যে সমস্যা দেখা দিয়েছে বিরাট দেহ ও হ্রস্ব বিবেকের সেই সমস্যা সমাধানের জন্য মানববিদ্যা চর্চা যত বেশী হয় ততই মঙ্গল। তিনি আশা পোষণ করেন যে, উচ্চতর মানববিদ্যা গবেষণা কেন্দ্র এর গবেষণালব্ধ কর্মদ্বারা আগামী দিনগুলোকে উজ্জীবিত করবে। শিক্ষক শিক্ষার্থী ও গবেষকগণ নতুন নতুন জ্ঞান অর্জন করে সমৃদ্ধ হবেন। তিনি আরো বলেন যে, মানববিদ্যা হচ্ছে প্রাথমিক বিদ্যা যা প্রতিনিয়ত সম্প্রসারিত হচ্ছে, গভীরতর হচ্ছে, ব্যাপক হচ্ছে।

পরিচালক অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম তাঁর উদ্বাধনী বক্তৃতায় কেন্দ্রের লক্ষ ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেন:

জ্ঞানানুশীলন ও সত্যানুসন্ধানের সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান হিসেবে শিক্ষাদান বা জ্ঞান বিতরণ বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। কিন্তু অন্যতম হলেও শুধু শিক্ষাদানই যে বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র কাজ নয়, সনিষ্ঠ অনুসন্ধান ও সুগভীর গবেষণার মাধ্যমে নতুন তথ্য ও তত্ত্ব আবিষ্কারও যে বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষকদের দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত, তা-ও অনস্বীকার্য। এজন্যই পূর্ণাঙ্গ আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় বলতে বোঝায় এমন একটি বিদ্যাপীঠকে যেখানে যুগপৎ চলতে থাকে জ্ঞান আহরণ ও বিতরণের, অর্থাৎ গবেষণা ও শিক্ষাদানের যুগ্ম কর্মধারা। আর পরিপূর্ণ শিক্ষক বলতেও নির্দেশ করা হয় এমন একজন সন্ধানী ব্যক্তিকে যিনি একাধারে জ্ঞানের গবেষক ও পরিবেশক।

তিনি আশা পোষণ করে বলেন যে, এই কেন্দ্র হবে একটি ব্যতিক্রমধর্মী প্রতিষ্ঠান এবং 'হিউম্যান প্রেডিক্যামেন্ট' তথা মানবজাতির সংকটময় মুহূর্তে এই কেন্দ্র পথনির্দেশ প্রদান করবে এবং মানুষ ও তার মৌল সমস্যা নিয়ে সুগভীর অধ্যয়ন ও গবেষণা চালিয়ে যাবে।

সভাপতির ভাষণে কেন্দ্রের সভাপতি অধ্যাপক মমতাজুর রহমান তরফদার বলেন যে, ১৯৪৭ সাল থেকে আজ পর্যন্ত আমাদের মানবিক মূল্যবোধ, নৈতিকতা, যুক্তিবাদ, বিজ্ঞান ও প্রকৌশলের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির তেমন কোনো উন্নতি হয়নি, আমরা আজো রয়েছি পশ্চাৎপরিমতার দিকে যার ফলে আমাদের কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি সম্ভব হয়নি। তাই আমাদের প্রয়োজন চিন্তার স্বাধীনতা ও উন্নতমানের সমাজ-সংস্কৃতি। এই কেন্দ্র সে ধরনের কার্যক্রম চালিয়ে দেশকে অগ্রগতির পথে নিয়ে যাবে বলে তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন। তাই তিনি বলেন:

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাঠামোর আওতায় একটি অঙ্গ-প্রতিষ্ঠান হিসেবে এই গবেষণা কেন্দ্রের উদ্ভব। বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক 'জীবনে যে সকল আদর্শের ও মূল্যবোধের প্রয়োজন আছে, তাদেরকে বাদ দিয়ে এই কেন্দ্রের স্থিতিশীলতা ও বিকাশ সম্ভব নয়। কোনো গবেষণা-কর্মসূচীর সুষ্ঠু বাস্ত বায়নের জন্য যে সব পূর্ব শর্ত অত্যন্ত জরুরী, তাদের মধ্যে একটি হচ্ছে গবেষকদের চিন্তার স্বাধীনতা এবং অপরটি গবেষণা-কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের নিরঙ্কুশ স্বাধিকার। চিন্তার স্বাধীনতা বলতে চিন্তাভাবনা প্রকাশ করার স্বাধীনতা বুঝায়।

মানববিদ্যার গবেষণা নিয়ে মানুষের মনে যে নেতিবাচক মনোভাব রয়েছে সে প্রসঙ্গে তিনি বলেন:

অনেকেই প্রশ্ন করেন, মানববিদ্যা সংক্রান্ত গবেষণার ফলাফল কি ব্যবহারিক জীবনে আদৌ কাজে আসবে? আমাদের ধারণা, এই গবেষণা দু' রকমভাবে কাজে লাগতে পারে। সাহিত্য, দর্শন, ইতিহাস ও সমাজবিজ্ঞানের গবেষণাধর্মী চর্চা সামগ্রিকভাবে আমাদের মনের উৎকর্ষ সাধন করতে পারে। ঐ চর্চার ফলে আমাদের মনের অনুশীলন-পরিশীলন ঘটে, আমাদের বুদ্ধিবৃত্তির গণ্ডীও প্রসারিত হয় এবং সবচেয়ে বড় কথা, মানবিক ক্রিয়াকর্মের সামগ্রিকতাকে আমরা নিবিড়ভাবে বুঝতে পারি। সমগ্র সভ্যতা-সংস্কৃতি তার ফলে আমাদের কাছে বোধগম্য হয়। মানব সমাজের একটি বিশাল অংশ যখন ক্রমাগত dehumanised বা মানবিক গুণ বর্জিত হয়ে ধ্বংসের প্রায় মুখোমুখি হয়েছে, তখন মানুষকে ঘনিষ্ঠভাবে জানার এই প্রয়াস কি একটি বড় কাজ নয়? অনেকই বলতে পারেন যে, মানববিদ্যা অনুশীলনের কল্যাণকর দিক সম্বন্ধে এটি একটি ভাববাদী ধারণা। আমাদের মনে হয়, কোনো সমাজ সম্বন্ধে পরিপূর্ণ জ্ঞান লাভ করতে পারলে তার বর্তমান সমস্যা-সঙ্কটের দূরীকরণের জন্য বস্তুগত ভিত্তিতে ব্যবস্থা গ্রহণ করাও সম্ভব। যদি কোনো লোকগোষ্ঠীর সাহিত্য, দর্শন ও ইতিহাস পড়ে তাদের সমাজ-জীবনের দুর্বল ও ভেদ্যঅংশগুলি খুঁজে বের করতে পারা যায়, তবে তাদের জীবনের সার্বিক উন্নতির লক্ষ্যে বিভিন্ন রকমের সক্রিয় পন্থাও খুঁজে বের করা অসম্ভব নয়। তবে মানববিদ্যার প্রয়োগমূল্য নেই, এ-অভিমত তাই ভ্রান্ত বলে মনে হয়। তবে মানববিদ্যার civilizing influence কে আগ্রাহ্য করা যাবে না। বিজ্ঞান ও প্রকৌশল যেমন দ্রুতভাবে আমাদের জৈবিক প্রয়োজন মেটাতে পারে, মানববিদ্যার প্রয়োগ তেমন তাৎক্ষণিকভাবে ফলপ্রদ হতে পারে না।

তিনি আশাবাদী, তাই তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, উচ্চতর মানববিদ্যা গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের বৌদ্ধিক ক্ষেত্রে ও সার্বিক অগ্রযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।